জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খালি হচ্ছে বাংলাদেশের গ্রামগুলো, শহরে বাড়ছে বস্তিবাসীর সংখ্যা

image_pdfimage_print

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে ইতোমধ্যেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দারা। ঘুর্ণিঝড় ও বন্যার শিকার হয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই বাসিন্দারা জেলে ও কৃষকের পেশা ছেড়ে পাড়ি জমাচ্ছেন শহরের জনাকীর্ণ বস্তিগুলোতে।
গত মে মাসে ঘুর্ণিঝড় আম্পানের কবলে পড়ে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন সাতক্ষীরার চাকলা গ্রামের শতশত বাসিন্দা। নদীতে ভিটেমাটি হারিয়ে ৫৬ বছরের ফারুক হোসাইন এখন পূর্বের কৃষিকাজ ছেড়ে পরিবারসহ খুলনায় ছোট্ট একটি ঘর ভাড়া নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘চিরদিনের জন্য বাবার ঠিকানা ছেড়ে এসেছি। আমার চার ভাই আগেই চলে গিয়েছে। এতদিন মাটি কামড়ে পড়ে ছিলাম। কিন্তু প্রকৃতির শক্তি কাছে হেরে গিয়েছি।’
গত মাসে প্রলয়ংঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় ভোলার ৫০তম বার্ষিকী পার করেছে বাংলাদেশ। ১৯৭০’ এর ওই ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় ৩ লাখের মতো মানুষ। সম্প্রতি বাংলাদেশে হানা দেয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে প্রাণহানি পূর্বের চেয়ে কমলেও একবার দুর্যোগের শিকার হওয়া গ্রামগুলোর জন্য পুনরায় মাথা তুলে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ বন্যা সতর্কতা ব্যবস্থাপনার উন্নতি করলেও অনেকেই মনে করছেন এটি ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ঠ না।
কুড়িয়া সদর এলাকার স্থানীয় কাউন্সিলের প্রধান হুমায়ন কবির বলেন, ‘১৯৬০ সালে নির্মিত বন্যা প্রতিরোধী বাঁধ কয়েকবারের দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারের কাছে পুননির্মাণের বারবার আবেদন করা সত্তেও এটি ঠিক করা হয় নি।’ কুড়িকাহুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সাত্তার বলেন, ‘১৯৮৬ সাল থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখছি। প্রতিবার দুর্যোগ আসে আর আমাদের সর্বস্বান্ত করে দিয়ে যায়। দুর্যোগের পর নতুন করে সব ঠিকঠিক করতে কয়েক বছর লাগে। ভালো বাঁধ না নির্মাণ করা পর্যন্ত এই সমস্যার সমাধান হবে না।’
আম্পানের ফলে সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার প্রায় প্রত্যেক বাসিন্দা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, বসতি হারিয়েছেন। খুলনার প্রতাপনগরের ১৮টি গ্রাম এখনো পানির নিচে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় বলেছে, এই বন্যায় প্রায় ৩ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। স্থানীয় এনজিও জানায়, এখনো ৫০ হাজার মানুষ বাস্তুহারা। তারা গত কয়েকমাস নদীর তীর ও রাস্তার পাশের সরকারী ক্যাম্প বা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে দিন কাটাচ্ছেন, কিছু মানুষ পাশ্ববর্তী গ্রাম বা শহরে চলে গিয়েছেন। অনেকে শুকনো জমির খোঁজে নতুন জায়গায় পাড়ি দিয়েছেন। কিন্তু করোনা মহামারী ইতোমধ্যে অনেক শ্রমিকের চাকরি খেয়েছে, আম্পানের ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠির আর্থিক অবস্থা হয়েছে আরো শোচনীয়, দুইটি চাষের মৌসুম চলে গিয়েছে। স্থানীয় পুকুর ও চিংড়ীর খামারগুলো বন্যায় ভেসে গিয়েছে।
বাজারে পণ্য সরবরাহ করা স্থানীয় গাড়ির ড্রাইভাররা নিজেদের গাড়ি বিক্রি করে নৌকা কিনেছেন। কুড়িকাহুনিয়া গ্রামের শাহজাহান মোড়ল (৪৫) বলেন, ‘জমিতে ধান চাষ করতাম। আমার ধানের জমি এখন পানির নিচে। এখন ধানক্ষেতে নৌকা চালিয়ে একপার থেকে আরেক পারে মানুষ পার করে দিনে ১০০-১৫০ টাকা পাই। এতে সংসার চলে না।’
এই গ্রামগুলোর বাসিন্দারা বলেন, আম্পানের আগে সিডর ও আলিয়ার মতো ঘুর্ণিঝড় গেলেও বাঁধ পুর্ননির্মাণ করা হয় নি। সাতক্ষীরার পানি উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা বোর্ডের জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলি আবুল খায়ের বলেন, ‘বাঁধ নির্মাণের আবেদন কয়েকবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এর ফলে সীমিত বার্ষিক বাজেট দিয়েই যতটুকু ঠিকঠাক করা যায় তা করতে হয়েছে।’
ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের নির্বাহী আলেক্সান্ডার বিলাক বলেন, ‘বাস্তুহারের সঠিক তথ্য নিরুপণের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান খোঁজা সম্ভব। স্থিতিশীল বাসস্থান নির্মাণের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। স্থায়ী নগরায়ন করতে হবে। বাস্তুতন্ত্র ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি অনেকটাই রোধ করা সম্ভব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *