গোল্ডেন মনিরের বিরুদ্ধে র‌্যাবের ৩টি মামলা, বাড্ডা থানার হস্তান্তর

image_pdfimage_print

রোববার (২২ নভেম্বর) সকালে অস্ত্র, মাদক ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে গোল্ডেন মনিরের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব)।
র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল ঢাকার মেরুল বাড্ডার ডিআইটি প্রজেক্টের ১৩ নম্বর রোডের ৪১ নম্বর বাড়ি থেকে গোল্ডেন মনিরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাড়িটিতে শুক্রবার রাত ১১টা থেকে গতকাল বেলা ১১টা পর্যন্ত মোট ১২ ঘণ্টার অভিযান চালায় র‌্যাব। র‌্যাব জানিয়েছে, একটি গোয়েন্দা সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে গোল্ডেন মনিরের নানা অপকর্মের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে।
পরে সেই তথ্য যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ করে মেরুল বাড্ডার বাসায় অভিযান চালানো হয়। র‌্যাবের অভিযানিক দলের সদস্যরা বলেছেন, মনির আন্দাজ করতে পেরেছিলেন তার বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাই তিনি গতকালই ইকে-৫৮৫ ফ্লাইটে দুবাই যাবার সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। কিন্তু বিদেশ পালিয়ে যাবার আগেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
র‌্যাবের মুখপাত্র লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানিয়েছেন, মনির হোসেনের বাসা থেকে বিদেশি একটি পিস্তল, চার রাউন্ড গুলি, চার লিটার বিদেশি মদ, ৩২টি নকল সিল, ২০ হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল, ৫০১ ইউএস ডলার, ৫০০ চাইনিজ ইয়েন, ৫২০ রুপি, ১ হাজার সিঙ্গাপুরের ডলার, ২ লাখ ৮০ হাজার জাপানি ইয়েন, ৯২ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত, হংকংয়ের ১০ ডলার, ১০ ইউএই দিরহাম, ৬৬০ থাই বাথ জব্দ করা হয়েছে। এগুলোর মূল্যমান ৮ লাখ ২৭ হাজার ৭৬৬ টাকা। এ ছাড়া ৬০০ ভরি (কেজি) স্বর্ণালংকার, নগদ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা ও তার বাসার গ্যারেজ থেকে ৬ কোটি দামের দু’টি ল্যান্ড ক্রুজার এবং তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অটো কার সিলেকশন থেকে আরো তিনটি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। পাঁচটি গাড়িই অনুমোদনহীন।
র‌্যাব সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে গোল্ডেন মনিরের দুই শতাধিক প্লটের সন্ধান মিলেছে। কেরানীগঞ্জ, বাড্ডা, পূর্বাচল, গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা এলাকাসহ আর কিছু এলাকায় এসব প্লট রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ডজন খানেক বাড়ি ও মার্কেট রয়েছে। এসব সম্পদের আনুমানিক মূল্য ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা।
তবে র‌্যাব জানিয়েছে গোল্ডেন মনিরের প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ আরো অনেক বেশি। তার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের তথ্য এখনো মিলেনি। ধারণা করা হচ্ছে বিভিন্্ন ব্যাংক হিসাবে তার বিপুল পরিমাণ টাকা রয়েছে। এ ছাড়া বিদেশের অনেক দেশে তার নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। এসব দেশে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সেকেন্ড হোম থাকতে পারে।

র‌্যাব জানিয়েছে, চোরাচালানের দায়ে ২০০৭ সালে ঢাকার বিভিন্ন থানায় গোল্ডেন মনিরের নামে একাধিক মামলা হয়েছিল। সরকারি নথি চুরি করে সিল জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি জমি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ২০১২ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) তার নামে মামলা করেছিল। ২০১৯ সালে অবৈধ সম্পদ অর্জনের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) তার নামে একটি মামলা করেছিল। রাজউক ও দুদকের মামলা দুটি এখনও চলমান আছে।
র‌্যাবসূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তেই গোল্ডেন মনিরের হাজার কোটি টাকার ওপরে অবৈধ সম্পদ রয়েছে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তার আরও অনেক বেশি সম্পদ রয়েছে। মনির রাজউক ও গণপূর্ত অধিদপ্তরে এক যুগের বেশি সময় ধরে আধিপত্য বিস্তার করে আসছিলেন। রাজউক ভবনে তার নামে একটি কক্ষ বরাদ্দ ছিল। ওই কক্ষে বসেই তিনি তার প্লট ভাগানোর কাজ হাসিল করতেন। বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ম্যানেইজড করে সরকারি নথি চুরি করতেন। পরে সিল ও সাক্ষর নকল করে প্লট নিজের নামে করে নিতেন। অভিযোগ আছে এই কৌশলে তিনি এখন পর্যন্ত আড়াই থেকে তিন শতাধিক প্লট নিজের করে নিয়েছেন।
এক্ষেত্রে যেসব কর্মকর্তা বাধার সৃষ্টি করতেন টাকা দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করে রাখতেন। কাউকে আবার ভয়ভীতি দেখাতেন। অভিযোগ আছে গোল্ডেন মনিরের আধিপত্যর কাছে রাজউকের অনেক কর্মকর্তাই তটস্থ হয়ে থাকেন। শুধু রাজউক নয় তার ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। র‌্যাবের হাতে আগেই গ্রেপ্তার হওয়া টেন্ডারমোঘল জিকে শামীমের সঙ্গে গোল্ডেন মনিরের রেষারেষি অনেক দিনের।
শিক্ষাভবন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই টেন্ডারবাজদের কাহিনী সবাই জানতেন। জিকে শামীম র‌্যাব কর্তৃক গ্রেপ্তারের পর গণপূর্ত অধিদপ্তরে মনিরের রাজত্ব শুরু হয়। অভিযোগ আছে, বড় অংকের টাকার বিনিময়ে গণপূর্তের অনেক বড় বড় পদে নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের বদলি করাতেন মনির। পরে তাদের মাধ্যমেই স্বার্থ হাসিল করতেন।

সূত্র জানিয়েছে, গোল্ডেন মনির চলাফেরা করেন তিন কোটি টাকা দামের গাড়িতে। এমন দামের ল্যান্ড ক্রজারের দুটি গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-ঘ- ১৫-৭০০৭ ও ঢাকা মেট্রো-ঘ-৪৪৪৪) তিনি নিয়মিত ব্যবহার করেন। এই দুটি গাড়ির কোনো বৈধ কাগজপত্র তিনি দেখাতে পারেননি বলে র‌্যাব জানিয়ছে। অনুমোদনহীন এই দুটি গাড়িই জব্দ করেছে র‌্যাব।
এছাড়া তার অটো কার সিলেকশন শো-রুম থেকে আরও তিনটিসহ মোট পাঁচটি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। এসব গাড়ি বিআরটিএ থেকে কিভাবে রেজিষ্ট্রেশন হয়েছে এখন এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। র‌্যাব জানায়, গোল্ডেন মনিরের দুটি বৈধ অস্ত্রের পাশপাশি একটি অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। এই অবৈধ অস্ত্রটি তিনি কি কাজে ব্যবহার করতেন সেটি খতিয়ে দেখছে র‌্যাব।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার স্বর্ণ চোরাকারবারীদের অন্যতম ছিলেন গোল্ডেন মনির। কর ফাঁকি দিয়ে তিনি কি পরিমাণ স্বর্ন দেশে নিয়ে এসেছেন তার হিসাব নাই। চোরাকারবারের সাপোর্টের জন্য তার ঢাকায় কয়েকটি স্বর্নের দোকান আছে বলে জানাগেছে। সিঙ্গাপুর, ভারত, দুবাই ও মালয়েশিয়া রুটে তিনি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে আসতেন।

র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির মুখপাত্র লে, কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেছেন, গোল্ডেন মনিরের মানি লন্ডারিংয়ের জন্য সিআইডি, কর ফাঁকি দিয়ে পণ্য আমদানি করার জন্য এনবিআর, অবৈধ সম্পদ অর্জনের জন্য দুদক ও অনুমোদনহীন গাড়ি রেজিষ্ট্রেশনের বিষয়ে খোঁজ নিতে বিআরটিএ কে তারা চিঠি দিবেন। যাতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *