ইতালির ‘চেরি টমেটো’ চাষ হচ্ছে চাঁদপুরে!

image_pdfimage_print

ইতালির বিশ্ববিখ্যাত ‘চেরি টমেটো’র চাষ শুরু হয়েছে চাঁদপুরে। কৃষক হেলাল উদ্দিন জেলায় প্রথববারের মত এই উন্নত জাতের টমেটো চাষ করে তাক লাগিয়েছেন। প্রচুর পরিমাণে ফলন হওয়ায় স্থানীয় কৃষক ও বেকার যুবকরাও উদ্ধুদ্ধ হচ্ছেন এই টমেটো চাষে। এদেশের আবহাওয়ায় ফলন ও বাজারে দাম ভালো থাকায় এই জাতের টমেটো চাষে কৃষকরা বেশি লাভবান হতে পারবে বলে মনে করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
চাঁদপুর সদর উপজেলার শাহতলী এলাকার কৃষক হেলাল উদ্দিন পত্রিক পরিত্যাক্ত ইটভাটায় বিদেশী বিভিন্ন জাতের ফল চাষ করে ইতমধ্যে সারা ফেলেছেন। ইটভাটার দুই একর জমি পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন ‘ফ্রুট ভ্যালী’ নামের প্রতিষ্ঠান। সেখানে তিনি বিদেশী ফল সাম্মাম, রক মেলন, মাস্ক মেলন, স্ট্রবেরি, ক্যাপসিক্যাম চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন। এবার বাণিজ্যিকভাবে ৩০ শতাংশ জমিতে চাষ করেছেন চেরি টমেটো। সুদূর ইতালি থেকে আনিয়েছেন এর বীজ। প্রতিটি গাছে ব্যাপক ফলন হওয়ায় এবারও সফল হয়েছেন তিনি।
সরেজমিন, শাহতলী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গাছগুলোতে থোকায় থোকায় ঝুলে রয়েছে চেরি টমেটো। আকারে আঙুরের চেয়ে কিছুটা বড় হয় এই টমেটো। কাঁচা অবস্থায় সবুজ থাকলেও পাকলে এই চমেটো ঘাড় লাল ও কমলা রং ধারণ করে থাকে।
পরিত্যক্ত ইট ভাটার মালিক হেলাল উদ্দিন বলেন, সারা বিশ্বেই চেরি টমেটো একটি উচ্চ চাহিদা সম্পন্ন সবজি। বাংলাদেশও এর চাহিদা অনেক। আমি চেরি টমেটো বাণিজ্যিকভাবে চাষ করার উদ্যোগ নেই। সেই উদ্দেশ্যে ইতালি থেকে চেরি টমেটোর একটি বিখ্যাত জাত ‘ম্যাগলিয়া রোসা’র বীজ আনার ব্যবস্থা করি।
তিনি বলেন, আমি কোনো রাসায়নিক ক্যামিকেল ব্যবহার করি না। হাইজেনিক পদ্ধতিতে জৈব সার ব্যবহার করে সফল ফলিয়ে থাকি। চেরি টমেটো একটি শীত প্রধান দেশের সফল হলেও এদেশের আবহাওয়ায় ভালো ফলন হয়েছে। এতো বেশি ফলন দেবে আমি আশা করিনি। প্রতিটি গাছে কোনো পাতা রাখাই জায়গা নেই। আঙুরের মতো থোকায় থোকায় ঝুলে আছে টমেটো। গাছগুলোও অনেক বড় ও মজবুত হয়। সাধারণত একবার লাগাতে অন্তত চার মাস ফলন পাওয়া যায় এই টমেটো গাছ থেকে। প্রতিটি গাছ থেকে সাত থেকে আট কেজি টমেটো পাওয়া যায়।
কৃষক হেলাল বলেন, মজার বিষয় হলো, অন্যান্য হাইব্রিড ফসলের বীজ থেকে চারা উৎপন্ন না হলেও এই টমেটোর বীজ সংগ্রহ করে তা থেকে চারা উৎপন্ন সম্ভব। অনেকেই আমার কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করার কথা জানিয়েছেন। আমিও আগ্রহীদেরকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। কৃষকরা যদি এই জাতের টমেটো চাষে উদ্বুদ্ধ হয়। তবে, তারা অনেক বেশি লাভবান হবে বলে জানান তিনি।
হেলাল উদ্দিন বলেন, চেরি টমেটোতে উচ্চ এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এটিতে অনেকেই যৌবন ধরে রাখার ঔষধ বলে থাকে। তাই বাজারে এর চাহিদাও অনেক। রাজধানীর বিভিন্ন সুপার সপগুলোতে চেরি টমেটো কেজি প্রতি ৯০০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। তবে আমি সাড়ে ৩শ’ টাকা দরে বিক্রি করছি।
হেলালের মতে, চাষ সারা দেশে চেরি টমেটোর চাষ ছড়িয়ে গেলে কৃষকদের ভাগ্য বদলে যাবে। এটি অতি উচ্চ ফলনশীল সবজি। দীর্ঘ সময় এর ফলন পাওয়া যায়। সহজে পচন ধরে না। বাজারে ব্যাপক চাহিদার কারণে কৃষকরা অনেক লাভবান হবেন বলে মনে করেন তিনি।
হেলালের বাগানে কাজ করা কৃষক মো. আবু হানিফ ও মিন্টু গাজী বলেন, আমাদের দেশীয় টমেটো গাছের চেয়ে লম্বায় অনেক বড় হয় এই জাতের গাছটি। ছোট আকারের প্রচুর পরিমাণে টমেটো ধরে প্রতিটি গাছে। তবে অতিরিক্ত গরমে ফলন ভালো হয় না এই গাছে। তাই আমরা বাগানের উপড়ে সেড তৈরি করে দিয়েছি।
মৈশাদী ইউনিয়ন কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, চাঁদপুরে এই প্রথম চেরি টমেটোর চাষাবাদ করা হয়েছে। ইতালি থেকে এর বীজ আনিয়েছেন এই কৃষক। দেশে চেরি টমেটোর বেশ চাহিদা রয়েছে। কৃষকরা বাণিজ্যিকভাবে চাষ করলে এই সবজির আমদানি নির্ভরতা কমবে। শীতকালে দোঁআশ ও বেলে মাটিতে এই টমেটোর চাষ করলে কৃষকরা লাভবান হতে পারবেন।
স্থানীয় কৃষক আমির আলী ও যুবক মো. আকাশ বলেন, আমরা এতোদিন টিভিতে এই জাতের টমেটোর দেখেছি। এবারই প্রথম নিজ চোখে দেখার সুযোগ পেলাম। আশাকরি আগামীতে আমরাও এই টমেটো চাষ করে লাভবান হতে পারবো।
চাঁদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, চেরি টমেটো’ চাষাবাদে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করছি। বিশেষ করে শাহতলী এলাকায় এই বিদেশী নতুন সবজি চাষ কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করবে। চেরি টমেটো সুস্বাস্থ্যের জন্যও অনেক উপকারী সবজি। অন্যান্য কৃষকরা এই ফসল উৎপাদনে এগিয়ে আসলে লাভবান হবে বলে আশা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *